সমাজ

স্ক্রিনের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া শৈশব ও আমাদের দায়িত্ব

বর্তমান ডিজিটাল যুগে মোবাইল ফোনের আসক্তি কীভাবে আমাদের পারিবারিক বন্ধন ও সন্তানদের মানসিক বিকাশে প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে একটি আন্তরিক আলোচনা এবং উত্তরণের কিছু ব্যবহারিক উপায়।

স্মার্টফোন

প্রযুক্তির মায়াজাল ও আমাদের বর্তমান বাস্তবতা

আজকের দিনে আমাদের ড্রয়িংরুমের দৃশ্যটা বড় অদ্ভুত। বাবা হয়তো সোফায় বসে নিউজ ফিড স্ক্রল করছেন, মা ব্যস্ত কোনো সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপের আলোচনায়, আর সন্তানটি কোণায় বসে গেম খেলছে। আমরা একই ছাদের নিচে আছি, কিন্তু কেউ কারো সাথে কথা বলছি না। প্রযুক্তির এই আশীর্বাদ এখন আমাদের সম্পর্কের জন্য এক নীরব অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মোবাইল ফোন আমাদের হাতের মুঠোয় পৃথিবী এনে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ঘরের ভেতরের মানুষগুলোকে একে অপরের থেকে আলোকবর্ষ দূরে সরিয়ে দিয়েছে।

কেন আমরা স্ক্রিনে আটকে যাচ্ছি?

মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো সংযোগ খোঁজা। সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের সেই সংযোগের একটি কৃত্রিম অনুভূতি দেয়। লাইক, কমেন্ট আর নোটিফিকেশনের শব্দ আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ করে, যা বারবার সেই স্ক্রিনের দিকে আমাদের টেনে নিয়ে যায়। কিশোর-কিশোরীদের জন্য এটি আরও বেশি ভয়ংকর, কারণ তাদের আবেগীয় নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা এখনো পূর্ণতা পায়নি। তারা ভার্চুয়াল জগতের পারফেক্ট জীবনের সাথে নিজের বাস্তব জীবনের তুলনা করে হীনম্মন্যতায় ভোগে।

অভিভাবক হিসেবে আমাদের করণীয়

অভিভাবক হিসেবে আমরা যদি নিজেরা সারাক্ষণ ফোনে ডুবে থাকি, তবে সন্তানদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। তারা আমাদের কথাই শোনে না, তারা আমাদের কাজ দেখে শেখে। তাই পরিবর্তনের শুরুটা হতে হবে আমাদের থেকেই:

  • ডিজিটাল কার্ফিউ: রাতে ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে বাড়ির সবার ফোন নির্দিষ্ট স্থানে রেখে দেওয়ার অভ্যাস করুন।
  • কোয়ালিটি টাইম: দিনে অন্তত একটি সময় রাখুন যখন বাড়ির কারো হাতেই ফোন থাকবে না। খাবার টেবিলকে ফোনমুক্ত এলাকা ঘোষণা করুন।
  • বিকল্প বিনোদন: সন্তানদের সাথে বই পড়া, বাগান করা বা সাধারণ কোনো ইনডোর গেম খেলার অভ্যাস তৈরি করুন।
  • খোলামেলা আলোচনা: ফোন ব্যবহারের ভালো ও মন্দ দিকগুলো নিয়ে তাদের সাথে বন্ধুর মতো কথা বলুন। ভয়ের চেয়ে সচেতনতা বেশি কার্যকর।

"তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।" (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ২৫৫৪)

প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও ভারসাম্য

আমরা প্রযুক্তি বিরোধী নই, বরং আমরা ভারসাম্যপূর্ণ জীবনে বিশ্বাসী। মোবাইল ফোন একটি টুল বা যন্ত্র, এটি যেন আমাদের জীবনের পরিচালক না হয়ে ওঠে। আমরা যদি আমাদের সন্তানদের শৈশবকে স্ক্রিনের নীল আলো থেকে বাঁচাতে চাই, তবে আমাদেরকেই তাদের জন্য বাস্তব জগতের আনন্দগুলো খুঁজে দিতে হবে। মনে রাখবেন, একটি বাচ্চার জন্য বাবা-মায়ের সাথে কাটানো দশ মিনিটের অর্থবহ আলাপ, ইন্টারনেটের এক ঘণ্টার ভিডিওর চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।

আসুন, আমরা স্ক্রিনের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসি। একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলি, হাসি-ঠাট্টা করি। জীবনটা তো এই মুহূর্তেই, যা ফোনের ক্যামেরায় বন্দি করার চেয়ে অনুভব করা বেশি জরুরি।

তথ্যসূত্র

  1. সহীহ বুখারী, হাদিস নং ২৫৫৪

আরও পড়ুন

সব লেখা দেখুন
সমাজ৭ মিনিটের পড়া

‘ডিভাইস আসক্তি’ এবং নতুন প্রজন্মের বাবা-মায়ের দ্বিমুখী পথচলা

ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়ার সীমাহীন ব্যবহার বড় থেকে ছোট কাউকে অক্ষত রাখেনি।

সমাজ৬ মিনিটের পড়া

নিউট্রিশন নিয়ে আমাদের বিভ্রান্তি এবং নিজেদের বানানো কিছু ‘মিথ’

মাসখানেক আগে ২২ থেকে ২৩ বছর বয়সী পূর্বপরিচিত এক ছেলে মেন্টাল সাপোর্টের জন্য আমার সাথে যোগাযোগ করে।

সমাজ৪ মিনিটের পড়া

স্মিত হাসির আড়ালে লুকানো নেশা: আপনিও কি আপনার সন্তানের মতো আসক্ত

স্ক্রিন অ্যাডিকশনের কারণে শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া থেকে শুরু করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক বিকলাঙ্গতা পর্যন্ত ঘটতে পারে

কোনো বিষয়ে পরামর্শ প্রয়োজন?

আপনার পরিবারের পরিস্থিতি নিয়ে একান্তে কথা বলতে একটি সেশন বুক করুন।

সেশন বুক করুন

যোগাযোগ করুন

আপনার প্রশ্ন বা প্রয়োজনের কথা লিখুন—সাধারণত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উত্তর দেওয়া হয়।

আপনার তথ্য সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে।

সরাসরি ইমেইল করুনchowdhury.mohammad.arif@gmail.com